বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
No menu items!
Homeজাতীয়আপসহীন নক্ষত্রের চির বিদায়

আপসহীন নক্ষত্রের চির বিদায়

মোরনিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুরো দেশকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মৃত‍্যুকালে দেশের জনপ্রিয় এই নেত্রীর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। দেশ-বিদেশে তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নারী প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয় এ নেত্রী আজ দেশবাসী, দলীয় নেতাকর্মী, ভক্ত ও অনুসারীদের কাঁদিয়ে পরলোকে পাড়ি জমান।

শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরা বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান, নাতনি ব্যারিস্টার জাইমা রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস‍্য, দলীয় নেতাকর্মী ও শুভানুধ‍্যায়ীরা।

সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারা দেশে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ‍্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকাচ্ছন্ন নেতাকর্মীরা ভিড় করেছেন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এভারকেয়ার হাসপাতাল, চেয়ারপারসনের গুলশানের বাড়ি ও রাজনৈতিক কার্যালয় এবং নয়াপল্টন এলাকায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন তাঁর ভক্ত, অনুসারী ও সাধারণ মানুষ।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বাবায়ক নাহিদ ইসলাম, এবি পার্টির মুজিবুর রহমান মঞ্জু গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফুসফুসের সংক্রমণ থেকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চলতি বছরের ২৩ নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর দেখা দেয় নিউমোনিয়া। এর সঙ্গে রয়েছে কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসের পুরোনো সমস্যা। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, একটি রোগের চিকিৎসা দিতে গেলে আরেকটির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছিল। তাঁর অনেক শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছিল। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালের কেবিন থেকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার স্বাস্থ‍্যে অবনতি হলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অবস্থা সংকটময় হলে এভারকেয়ার হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছিল।

শেখ হাসিনা সরকারের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। সেদিনই তিনি কারাবন্দি হন এবং রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয় তাঁর কারাবাস। একই বছরের ৩০ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় খালেদা জিয়ার সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে ১০ বছর করে আদেশ দেন হাইকোর্ট। ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের আরেকটি মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত।

কারাগারে এক বছরের বেশি বন্দিজীবন কাটানোর পর চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বর্তমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ‍্যালয়) কেবিন ব্লকের প্রিজন সেলে নেওয়া হয়। ২০২০ সালে বিশ্বে করোনা মহামারি আকার ধারণ করলে ২৫ মার্চ তৎকালীন সরকারপ্রধানের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার দণ্ড ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়, পরে তা কয়েক দফায় বাড়ানো হয়। তখন থেকেই শর্তসাপেক্ষে মুক্ত খালেদা জিয়া গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় ছিলেন। এর মধ‍্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে একাধিকবার তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন।

২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর গণঅভ‍্যুত্থানে ক্ষমতাচ‍্যুত শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লে সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে উচ্চ আদালতে আপিলের শুনানি শেষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের দুই মামলাতেই খালাস পান খালেদা জিয়া।

এক নজরে খালেদা জিয়া

জন্ম : খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালে তৎকালীন অখণ্ড ভারতের দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ব্যবসার সুবাদে সেখানে বসবাস করতেন। যদিও আদি নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজীতে। তাঁর মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন দিনাজপুরের চন্দবাড়ির মেয়ে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর জলপাইগুড়ির চা ব্যবসা ছেড়ে ইস্কান্দর মজুমদার দিনাজপুর শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। তাঁর শৈশব ও কৈশোর পার হয়েছে দিনাজপুরে।

সোনালি শৈশব : নেতৃত্বের মাধুর্যময় গুণাবলীসম্পন্ন বেগম খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য শৈশবও ছিল অনন্য। দিনাজপুর শহরে কাটে তাঁর স্মৃতিময় শৈশব, সোনালি কৈশোর। জলপাইগুড়ি থেকে তিনি যখন দিনাজপুর আসেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র দুই বছর।

‘নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া’ বই থেকে জানা যায়, দিনাজপুরের ঈদগাঁ এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ওঠে খালেদা জিয়ার পরিবার। সেখানে তাঁর মেজো বোন বিউটি ছিলেন তাঁর খেলার সঙ্গী। পরিবারে খালেদা জিয়া ছিলেন তখন সবার আদরের পুতুল। তাকে কেউ তখন ধমক দিতে পারত না। আদর করতে হতো। সেই আনন্দময় শৈশবের মুহূর্তগুলো বর্ণনা করে খালেদা জিয়ার মা বেগম তৈয়বা মজুমদার বলেছেন, ‘পুতুল ছিল আমাদের সবার আদরের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই ও খুব সুন্দর। ও একটু বড় হলো, কিছু কিছু বুঝতে শিখল। আমরা যখন রোজা রাখতাম, তখন ও রোজা রাখতে প্রতিদিন কান্নাকাটি করত। একদিন তো সে একটি রোজা রেখেই দিল। অনেক চেষ্টা করেও আমরা তার রোজা ভাঙাতে পারিনি। আমার সঙ্গে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে সে নামাজ পড়ত। শবে বরাতের দিন ফকির-মিসকিনদের মধ্যে হালুয়া রুটি বিলাত। রাতে আমার সঙ্গে নামাজ পড়ত। ছোটবেলা থেকেই তার তেমন চাহিদা ছিল না।

পড়াশোনা : বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়া দিনাজপুর মিশনারি স্কুল, গালর্স হাইস্কুল ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়ালেখা করেছেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ক্যাপ্টেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর স্বামীর কর্মস্থলে চলে যান।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments