কুষ্টিয়া অফিস
শৈশব মানেই দুরন্তপনা, খেলা আর দুষ্টুমির ফাঁকেই শিশুদের নানা আচরণ আর লেখাপড়া শেখা। কিন্তু, ১৪ বছরের শিশু শান্তর জীবনটা এর উল্টো। জীবনের প্রথম তিন বছর তেমন বোঝা যায়নি, তবে ধীরে ধীরে তার অস্বাভাবিক আচরণ দেখে বোঝা যায় সে প্রতিবন্ধী শিশু। আর সব সাধারণ শিশুর থেকে ব্যতিক্রমী এই শিশুকে নিয়ে এখন রাজ্যের উৎকণ্ঠা তার দিনমজুর বাবা-মায়ের। শিশুটির চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তারা।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান উত্তর পাড়া গ্রামের মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে শান্ত হোসেন। হাঁটা-চলা স্বাভাবিক হলেও সে একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। সুযোগ পেলেই ময়লা-আবর্জনা, ড্রেনের বর্জ্য, মাটি, সাবান, কলা গাছ, কপির ডাঁটা, জামের আঁটি এমনকি মুরগির বিষ্ঠা পর্যন্ত খেয়ে ফেলে সে। শান্তর এই অস্বাভাবিক আচরণের কারণে জন্মের সাড়ে তিন বছর বয়স থেকেই দিন রাত বেঁধে রাখা হয় তাকে।
সরেজমিন জসিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে শান্তকে। এসময় অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে সে।
শিশু শান্তর বাবা জসিম উদ্দিন জানান, শান্তর জন্মের পরে আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে সাড়ে তিন বছর বয়সে তার অবস্থা বুঝতে পারি। শান্ত প্রথমে ময়লা-আবর্জনাসহ সামনে যা পায় তাই মুখে ঢুকিয়ে দেয়। বুঝতে পারে না কোনটা খাদ্য আর কোনটা অখাদ্য। এ অবস্থা দেখে ২০১৪ সালে সর্ব প্রথম রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাই। দুই দফায় এখানে দেখিয়েছি তাকে। এরপর ২০১৮ সালে নিয়ে যাই পাবনা মানসিক হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে টানা পাঁচবছর চিকিৎসা চালাতে বলেন। কিন্তু, টাকার অভাবে নিয়মিত আর চিকিৎসা করাতে পারিনি।
জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি পেশায় একজন দিনমজুর। বর্গা নিয়ে চাষ করি। অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে সংসার চালাই। ছেলের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারিনি।
বেঁধে রাখেন কেন এমন প্রশ্নের জবাবে জসিম উদ্দিন বলেন, দিনরাত সব সময় শান্তকে বেঁধে রাখতে হয়। না হলে বের হয়ে নির্জন কোনও জায়গায় চলে যায়। কখনও বাঁশের ঝাঁড়ে, বনে-বাদাড়ে, ক্ষেতের ভেতর ঢুকে বসে থাকে। যেখানে যায় বুদ্ধি কম থাকায় সেখানেই অনিষ্ট করে। নিজের ছোট দুই ভাইবোনকে এই আদর করে তো এই মারে। এজন্য বেঁধে রাখি। উপায় তো নাই। ছেড়ে দিলে যদি অন্য কারও ক্ষতি করে, বা যদি নিজেরই ক্ষতি করে। ওর তো বুদ্ধি কম। ভয়ে থাকি সারাক্ষণ।
এদিকে সোমবার মিরপুর উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে নবাগত জেলা প্রশাসকের মতবিনিময়কালে এক সাংবাদিক শান্তর বিষয়টি তুলে ধরেন। এসময় শিশু শান্তকে তাৎক্ষণিক দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্তঃ নেন কুষ্টিয়ার নবাগত জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেন। মতবিনিময় শেষে তিনি শিশু শান্তর শিকলে বাঁধা করুন জীবন নিজ চোখে অবলোকন করেন। এবং শান্তর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রামের গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। এসময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম।


